সাধারণ জনগণ জিম্মি এক সিন্ডিকেটের কাছে
টাঙ্গাইল জেলার সর্বদক্ষিণে ধলেশ্বরী নদীর অববাহিকায় চরবেষ্টিত নাগরপুর উপজেলা। ভৌগোলিক কারণে এ জনপদ বরাবরই অবহেলিত। সহজ-সরল মানুষ, যাদের জীবনের ইতিহাস জমিদারের শোষণ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রশাসনিক নিপীড়নে দগ্ধ। একদিন জমিদারের রক্তচক্ষুতে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত ছিল, আজ সেই ভীতি ঘনীভূত হচ্ছে উপজেলা ভূমি অফিসের স্থানীয় অধস্তন কর্মচারী নাজির সজীবের হাতে।
জনগণের অভিযোগ,এই নাজির সজীব মিলে তৈরি করেছে এক ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট; যাদের কাছে সেবা নয়, বরং ভোগান্তি এখন নিয়মিত চিত্র।
আধুনিককালের জমিদারি:
নাগরপুরের মানুষ মনে করেছিল, জমিদারি যুগ শেষ, এখন ভূমি অফিস হবে সাধারণ মানুষের সেবাকেন্দ্র। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল—জমিদারি কেবল পোশাক বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি। এখন আর চাবুকের আঘাত নেই, আছে কলমের জোর; নেই জমিদারের কোঠা, আছে উপজেলা ভূমি অফিসের ছোট্ট কক্ষ।সেবার নামে শোষণই আজ এদের নিয়ম।
সিন্ডিকেটের কৌশল:
জনগণের নানা বয়ানে উঠে এসেছে তাদের নানা অপকর্মের চিত্র—
রাতের আঁধারে বালু খেকোদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অবৈধ বালু কাটার অনুমতি দেওয়া।
স্থানীয় প্রশাসন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে বের হলে আগে থেকেই ক্ষুদেবার্তায় খবর পাঠিয়ে দেওয়া। ফলে অপরাধীদের ধরা যায় না।
মাটিকাটার যন্ত্রপাতির ব্যাটারি খুলে এনে বিক্রি করা।
জনবান্ধব স্টাফদের চরিত্রহননের হুমকী,
খারিজের ফাইলকে কেন্দ্র করে দালালি, তদবির ব্যবসা চালানো। বিধিমোতাবেক খারিজ না হলে দালালদের উসকে দিয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট মিথ্যা হয়রানীমূলক অভিযোগ করানো।
রাজনৈতিক পরিচয়ের মুখোশ পাল্টে নেওয়া—স্বৈরাচার আমলে কখনো ছাত্রলীগ, বর্তমানে বিএনপির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা একবার নাজির সজীব ও রকিবুলকে বেঁধে মারপিটও করেছে; পরে প্রশাসন তাদের উদ্ধার করে।
চরিত্রদের আড়ালে লুকানো কাহিনি:
নাজির সজীব:
বাড়ি উপজেলার বেকরা গ্রামে। প্রায় ছয় বছর ধরে একই উপজেলায়। বিয়ের চুক্তিতে শ্বশুরবাড়ির সহযোগিতায় ঘুষ দিয়ে চাকরি পান সৈরাচার সরকারের আমলে। নিজে পরকীয়ার জড়ালে স্ত্রীর অভিযোগের জেরে স্ত্রীকে মারপিট করায় বিচ্ছেদ হয়। কোর্টের রায়ে দেনমোহরের ২০ লাখ টাকা মাসিক ২৪ হাজার টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করছেন। পরে আবার নতুন বিয়ে; স্ত্রী নার্সিং কলেজে পড়ছেন। শহরে ১০ হাজার টাকা বাসা ভাড়া, মাসিক টিউশন ফি ৮ হাজার টাকা—সব মিলিয়ে ৬০-৭০ হাজার টাকার ব্যয়। অথচ বেতন মাত্র ২৪ হাজার টাকা।
প্রশ্ন জাগে—এই বিশাল ব্যয়ভার মেটাচ্ছে কে?
জনগণের মতে, উত্তরটা তার “অবৈধ আয়”। জানা যায় তিন বছরের উপরে কর্মরত স্টাফদের তালিকা চাহিদা পাঠালে নাজির নিজের নামের পাশে ০২ বছর যাবত কর্মরত লিখে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করেন।যাতে তার বদলি না হয়।
তার অফিস কক্ষ এখন দালালদের আড্ডাখানা। নারীরা সেবা নিতে এলে কৌশলে মোবাইল নাম্বার রেখে রাতে ফাইল আটকানোর ভয় দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দেওয়া তার নিত্যকার অভ্যাস।বিভিন্ন নারী এ বিষয়ে অভিযোগ দিলে এসিল্যান্ডের কাছে কেঁদে কেটে ক্ষমা চেয়ে রেহাই পান।
প্রশাসন ও সৎ কর্মকর্তার লড়াই:
জনগণের মতে, বর্তমান এসিল্যান্ড নাগরপুরের ইতিহাসে অন্যতম সৎ কর্মকর্তা। সেবাসহজিকরণের নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু পাঁজনের দৌরাত্ম্যে তার সব সৃজনশীলতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।তিনিও মূলত একরকম জিম্মি এদের কাছে।স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা চাপ সৃষ্টি করেন। বহুবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বদলির জন্য জানানো হলেও রহস্যজনক কারণে তা আটকে যায়। স্থানীয় প্রশাসনও দ্বিধায়—“না পারছে সইতে, না পারছে কইতে।”
সাধারণ মানুষের কণ্ঠ
এক ব্যবসায়ী বলেন—
“ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেলে মনে হয় যেন শেয়ালের খাঁচায় আটকা পড়েছি।”
এক কৃষক বলেন—“আমরা খারিজ করতে যাই, ওরা বলে‘তদবির লাগবে’।
বিধি মেনে কাজ করতে গেলে উল্টো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলে।”
অন্য এক ভুক্তভোগীর ভাষ্য—
“এরা এতটাই শক্তিশালী যে এসিল্যান্ড-ইউএনওও জিম্মি হয়ে আছে এদের কাছে ।”
নাগরপুরের ভূমি অফিস আজ সাধারণ মানুষের কাছে সেবাকেন্দ্র নয়, বরং ভয়ের প্রতীক। নাজির সজীব অধস্তন কর্মচারীর একচ্ছত্র দৌরাত্ম্যে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ইতিহাস সাক্ষী—জমিদাররা চলে গেছে, কিন্তু শোষণের শেকল এখনো অটুট। শুধু আকার পাল্টেছে, রূপ পাল্টেছে। তথ নিতে গেলে সাংবাদিক কে হুমকি দেন আপনাদের নামে মামলা করুম
এখনই যদি সিন্ডিকেট ভাঙা না যায়, তবে নাগরপুরের ভূমি সেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে।সাধারণ মানুষ চায়—দুর্নীতিবাজদের বদলি,কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা,সেবার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। নাগরপুররের চর যেমন প্রতি বর্ষায় ভাঙন- জোয়ারে টিকে থাকে, তেমনি সাধারণ মানুষও টিকে থাকবে। তবে শর্ত একটাই—এই সিন্ডিকেটের অবসান ঘটাতে হবে।জেলা প্রশাসন বিষয়টি দ্রুত ভেবে দেখবেন কী?