সাতক্ষীরার গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে কুমড়োর বড়ি তৈরির মহা উৎসব
মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
সাতক্ষীরার গ্রামাঞ্চলে শীত নেমেছে কয়েক দিন হলো। আর শীতের হাওয়ায় যেন নতুন ব্যস্ততার সুর ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে কুমড়োর বড়ি তৈরির মহা উৎসব। বড়ির পাটায় ডাল বাটা,কুমড়া কুচি করা, রোদে শুকানো সব মিলিয়ে গ্রাম গুলোতে তৈরি হয়েছে এক মৌসুমি কর্মযজ্ঞ। এই ঐতিহ্যবাহী খাবার এখন শুধু রান্নার স্বাদ নয়,বরং অনেক পরিবারের আয়-রোজ গারের অন্য তম ভরসা হয়ে উঠেছে।
সাতক্ষীরার কুমড়োর বড়ির সুনাম এখন জেলার সীমানা ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সহজলভ্য পাকা চালকুমড়া,মাশকালাই ডাল আর সামান্য লবণ এই সরল উপাদানে তৈরি বড়ির বাজারদরও আশাব্যঞ্জক। স্থানীয় বাজারে কেজি প্রতি ৩৫০-৪০০ টাকা,শহরের বাজারে আরও বেশি।
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদনের পরিমাণও।স্থানীয়দের ভাষায়,এখন আর বড়ি শুধু তরকারির স্বাদ বাড়ানোর জন্য নয় এটা পরিবার চালানোর মাধ্যমও। সাতক্ষীরার সদরের ফিংড়ী,ফয়জুল্যাপুর,বুধহাটা,নুনগোলা,ব্রহ্মরাজপুর, বড় খামার,কালেরডাঙা,কোমরপুর কোন গ্রামবাদ নেই। কাকডাকা ভোরে গৃহিণীদের বড়ি তৈরির প্রতিযোগিতায় ভরে ওঠে উঠান-বারান্দা। শুধু সদর নয়,কলারোয়া,তালা,দেবহাটা,কালীগঞ্জ,আশাশুনি ও শ্যামনগরের গ্রাম গুলোতেও একই চিত্র।
ফয়জুল্যাপুরের ফিরোজা বেগম বলেন,শীত এলেই আমাদের ঘরে বড়ি বানানোর ধুম পড়ে। সারা বছর সংরক্ষণ করে খাই। আবার অনেকে বিক্রিও করি। এখন শহরেই না,দেশের বাইরে পর্যন্ত বড়ি পাঠাচ্ছে ব্যবসায়ীরা।
আরেক গৃহবধূ সাদিয়া খাতুন বলেন,উপকরণ সস্তা, বানানো সহজ। দুই-তিন কেজি বড়ি বানালে একটা পরিবারের দিনের কাজের চাহিদা মিটে যায়। আবার বাড়তি আয়ের পথও খুলে যায়। কুমড়োর বড়ি এতটা জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বড়ি তৈরির পদ্ধতি রয়ে গেছে ঐতিহ্যিক ছোঁয়ায়। পাকা চালকুমড়াকে ছোট টুকরো করে কুচি করা হয়। মাশকালাই ডাল রাতভর ভিজিয়ে শিল-পাটায় বাটা হয়। কুমড়া-ডালের মিশ্রণে ঘন পেস্ট তৈরি করা হয়। নিপুণ হাতে বড়ি বানিয়ে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর বায়ুরোধী প্যাকেটে ভরে সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়। একেকটি পরিবার গড়ে প্রতিদিন ২-৩ কেজি বড়ি তৈরি করতে পারে। প্রতি কেজি বড়ির উৎপাদন খরচ ২০০-২৫০ টাকা, আর বিক্রি হয় ৩০০-৪০০ টাকা ফলে আয় বেশ ভালোই।
ফিংড়ীর কৃষক নিজাম সরদার বলেন,চালকুমড়া এখানে খুব ভালো হয়। আগে বিক্রি করতে গিয়েও টাকা পেতাম না। এখন বড়ি করার কুমড়ার দাম ভালো পাই। এটা কৃষকের জন্যও নতুন সম্ভাবনা।
উপজেলা প্রশাসনের সূত্র জানায়,কুমড়োর বড়িকে স্থানীয় খাদ্য শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উৎওপাদনকারী নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদর্শনী ও মেলা আয়োজন,উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণের সুযোগ ও বাজারজাতকরণের সহযোগিতা। এ ভাবে ধীরে ধীরে বড়ি উৎপাদনের পরিধি বাড়িয়ে একটি গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চাহিদা,বাজার ও দক্ষতা সব মিলিয়ে কুমড়োর বড়ি এখন সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন সংযোজন। নারীদের হাতে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী খাবার এক দিকে যেমন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখছে, তেমনি বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থানের নতুন পথও তৈরি করছে।
শীতের সকালের রোদে শুকানো বড়ির সারি দেখে মনে হয় এ যেন শুধু খাবার নয়,গৃহিণীদের জীবনের নতুন উৎসবে যোগ দেওয়ার আহ্বা