চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি।
ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন (১৯২৬ সালে ৩ ডিসেম্বর জন্ম ও ৮ অক্টোবর -২০১৪ মৃত্যু) হয়। ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ “ভাষা সংগ্রামের অগ্নিশিখা—ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন / ছাত্র মতিনের জন্মবার্ষিকী আজ।
বাংলা ভাষার ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে আমরা দেখি সংগ্রামের দাগ, ত্যাগের রক্তিম ছাপ এবং কিছু মানুষের অনড় অবদান, যাদের জীবন ছিল আন্দোলনের প্রতিটি সুরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন—যিনি ‘ভাষা মতিন’ নামে আমাদের collective memory-তে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছেন—তাঁর জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে স্মরণ নয়; একটি আদর্শ, একটি সাহস, একটি দায়বদ্ধতাকে আবার নতুন করে উপলব্ধি করা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোয় ছাত্রসমাজের অগ্রভাগে ছিলেন আব্দুল মতিন। তিনি ছিলেন সেই কণ্ঠযোদ্ধা, যিনি দাবি তুলেছিলেন বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার। পাকিস্তান শাসকদের অহেতুক নিষেধাজ্ঞা ও রক্তচাপা নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি ছাত্রদের একত্রিত করেছিলেন, পথ দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটি ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য প্রয়োজন সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগ। তাঁর স্লোগান, তাঁর নেতৃত্ব, তাঁর দৃপ্ত শপথের উচ্চারণ—সবই ভাষা আন্দোলনের সংগঠনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
ভাষার জন্য জীবনপণ সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক ছিল না; এটি ছিল অস্তিত্বের, আত্মপরিচয়ের, সংস্কৃতির। আব্দুল মতিন এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই আন্দোলনের প্রতিটি মোড়ে তিনি ছিলেন দৃঢ় এবং আপসহীন। গ্রেফতার, নির্যাতন, নজরদারি—কিছুই তাঁর অবস্থানকে নড়াতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাই তাঁর অগ্রযাত্রাকে করেছে আরও তীব্র, আরও প্রজ্জ্বলিত।
স্বাধীনতার পরও ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন ভাষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রশ্নে ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার। তাঁর লেখনী, বক্তৃতা এবং ভাবনা প্রমাণ করে যে ভাষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সদা-অটল। তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি জাতির অগ্রগতি, তার মানবিক ও গণতান্ত্রিক বিকাশ, ভাষার মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে জানানোর কাজে তিনি নিবেদিত ছিলেন শেষ বয়স পর্যন্ত।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করি, তখন শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বর্তমানের দায়ও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাংলা ভাষা আজও বহুক্ষেত্রে অবহেলার শিকার; শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, প্রযুক্তি—সব জায়গায় বাংলা এখনো তার প্রাপ্য মর্যাদা পুরোপুরি পায়নি। সুতরাং আব্দুল মতিনকে স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া বা আনুষ্ঠানিকতা নয়; তাঁর আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতার এক নতুন অঙ্গীকার।
ভাষা মতিন আমাদের শিখিয়ে গেছেন—ন্যায়বিচার, ভাষার মর্যাদা ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কখনোই আপস করা যায় না। তাঁর জন্মদিনে আমাদের শপথ হোক, বাংলা ভাষার ব্যবহারে, বিকাশে ও সম্মানে আমরা প্রত্যেকে হবো আরও সচেতন, আরও দায়িত্বশীল। অগ্নিশিখার মতো দীপ্ত সেই মানুষটির প্রতি জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও দোয়ার দরখাস্ত চৌহালী বাসির।