মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
সাতক্ষীরায় নীরব ঘাতক ব্যাধি থ্যালাসেমিয়া উদ্বেগ জনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালেই গত ২৩ মাসে ২ হাজার ৩৬ জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে যা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় সতর্ক বার্তা। রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে সিভিল সার্জন অফিস ছেলে-মেয়েদের বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছে। কারণ রোগটি সম্পূর্ণ জেনেটিক,অর্থাৎ পিতা-মাতার দেহে রোগ বহন করলে সন্তানও আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় এতটাই বেশি যে অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলছে।
আশাশুনির বসুখালী গ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ী লাভলু হোসেন এখন নদীর চরে চায়ের দোকান চালিয়ে জীবন চালান। তাঁর যমজ দুই মেয়ে শিরিনা ও শিউলি (১৭) তিন মাস বয়স থেকেই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত।
বছরের পর বছর রক্ত দেওয়া,নিয়মিত চিকিৎসা,শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২ লাখ টাকা। নিজের আয়,সঞ্চয়,জমি জমা সবই বিক্রি করতে হয়েছে। শেষ মেষ বসতবাড়িও বিক্রি করতে বাধ্য হন।
লাভলু বলেন,ডাক্তার বলেছে,এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয় না। যত দিন বাঁচবে,রক্ত লাগবে। দুই মেয়ের বি পজিটিভ রক্ত জোগাড় করতেই হিমশিম খাই।
কলারোয়ার দক্ষিণ ভাদিয়ালী গ্রামের সিরাজুল ইসলামের দুই মেয়ে জান্নাতুল নাহার পপি (২৬) ও সামিয়া নাজনিন (২১) নিয়মিত সদর হাসপাতাল ও ঢাকার থ্যালাসেমিয়া সেন্টারে চিকিৎসা নেন।
সামিয়া বলেন,প্রতি মাসে দুই বোনের চিকিৎসায় ৪৫-৫০ হাজার টাকা লাগে। এখন পর্যন্ত ৩৪-৩৫ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে।
চিকিৎসকেরা তাঁদের জানিয়েছেন,পিতা ও মাতা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বংশ গত জিন বহন করায় সন্তানদের শরীরে রোগ প্রকাশ পেয়েছে।
মুকুন্দপুরের কৃষক আব্দুল কুদ্দুসের মেয়ে আনোয়ারা খাতুন (২১) এর বয়স আট বছরেই রোগটি ধরা পড়ে। সংসার সামলানোই কঠিন তার ওপর রক্ত ও চিকিৎসা ব্যয়ে পরিবার প্রায় সর্বশান্ত। এর মধ্যে আব্দুল কুদ্দুস স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।
আশুরা খাতুন বলেন,ঋণ করে মেয়ের চিকিৎসা চালাই। কত দিন পারব জানি না।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের রেকর্ড বলছে,২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৩৬ জন নারী,পুরুষ ও শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন।এ ছাড়া সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মাসে বহু রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা.মো.আব্দুস সালাম বলেন,থ্যালাসেমিয়া পুরোপুরি জেনেটিক রোগ। তাই বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি।তিনি জানান,বিয়ের সময় এক জন যদি থ্যালাসেমিয়া বাহক হন,বিয়ে করা যায়। উভয়েই বাহক হলে বিয়েতে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ তাহলে পরবর্তী প্রজন্মে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা.কাজী আরিফ হোসেন বলেন, থ্যালাসেমিয়া নিরাময়যোগ্য নয়। রোগীকে জীবিত থাকতে নিয়মিত রক্ত নিতে হয়। তাই যে কোনো পরিবারে রোগ হলে সেই পরিবার সর্বশান্ত হয়ে যায়। তিনি আরও জানান, স্থায়ী চিকিৎসা হলো বোনম্যারো প্রতিস্থাপন,যা অত্যন্ত ব্যয় বহুল। উপকূলীয় এলাকায় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাই বিয়ের আগে পরীক্ষা করাই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।