মনির হোসেন জীবন, বিশেষ সংবাদদাতা : রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড একের পর এক বেড়েই চলেছে। যার ফলে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানাবিধ অপরাধ কর্মকাণ্ড। দেশে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছে দুর্বৃত্তরা। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ । এছাড়া অনেক জায়গায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড কিংবা হত্যার উদ্দেশে হামলা সাধারণ মানুষের মনে বাড়াচ্ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে অন্য আরেক ঘটনা উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছে দুর্বৃত্তরা। সন্ত্রাসীরা দিবালোকে সড়কে, বাসে, অটোরিকশায়, এমনকি বাড়ি ফেরার পথে সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালাচ্ছে। দেশে আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে অপেক্ষামান, অনাকাক্সিক্ষত অনেক ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নগরীর সাধারণ মানুষ। খবর সংশ্লিষ্ট একাধিক তথ্য সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ একাধিক বিশ্বস্থ সূত্রের।
তথ্য অনুসন্ধান, বিভিন্ন মহল, সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতার মধ্যেও এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে যেন এক অজানা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে। সামগ্রীক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে যৌথবাহিনীর কম্বাইন্ড (সম্মিলিত) অপারেশন চালানো হচ্ছে । বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন এলাকা ও রাস্তায় চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশীসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন উদ্বেগজনক অবনতির কারণে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছেন। তবে সরকার যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে অটল এবং যারা এই নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবেন, তারা ব্যর্থ হবেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি ।
খোঁজ খবর ও বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস (২৭) নামের এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন সাত জনকে গ্রেপ্তার করেছে র?্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র?্যাব)। র?্যাব-১৪ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ওই সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, মো. লিমন সরকার, মো. তারেক হোসেন, মো. মানিক মিয়া, এরশাদ আলী, নিজুম উদ্দিন, আলমগীর হোসেন ও মো. মিরাজ হোসেন আকন। নিহত দিপু চন্দ্র দাস জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ভালুকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস নামে একটি পোশাক কারখানার কর্মী ছিলেন। তার তিন বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গেল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৮টার দিকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করার অভিযোগে কারখানার ভেতরে একদল শ্রমিক দিপুকে মারধর শুরু করেন। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে জানান, মারধরের একপর্যায়ে হামলাকারীরা দিপুকে কারখানার বাইরে নিয়ে যায়। সেখানে স্থানীয় লোকজনও তাদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং পিটুনিতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে হামলাকারীরা তার মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে মরদেহ আংশিক পুড়ে যায়। পুলিশ পরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। দিপুকে হত্যার ১৩ দিনের মাথায় ৩১ ডিসেম্বর,২০২৫ শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে ছুরিকাঘাতের পর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। তিনদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শনিবার সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দিপু ও খোকনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা সাড়াদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যেই নরসিংদীর এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। গত সোমবার রাত ১১টার দিকে পলাশ উপজেলার চরসিন্ধুর বাজারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মনি চক্রবর্তী (৪০) নামে এক মুদি ব্যবসায়ী। পলাশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহেদ আল মামুন গণমাধ্যমকে জানান, নিহত মনি চক্রবর্তী শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়নের মদন ঠাকুরের ছেলে। মনি চক্রবর্তী দীর্ঘদিন ধরে চরসিন্দুর বাজারে মুদির দোকান চালিয়ে আসছিলেন। তাকে হত্যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ। নরসিংদীর এ ব্যবসায়ীকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তিনজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হল।
এ প্রসঙ্গে মনি চক্রবর্তী হত্যার ঘটনার বর্ণনায় পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছে, তিনি সোমবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে অজ্ঞাত পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা টের পেয়ে মনিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গেল সোমবার সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগী (৩৮) কে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যশোরের কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে। মনিরামপুরের কপালিয়া বাজারে তাঁর একটি বরফ তৈরির কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া তিনি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিডি খবর’ নামের একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।
স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি, এলাকাবাসী ও পুলিশ সাংবাদিকদের জানায়, গেল সোমবার বিকেলে রানা প্রতাপ বৈরাগী মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে তাঁর বরফকলে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যা আনুমানিক পৌনে ছয়টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে আসা তিন দুর্বৃত্ত তাঁকে বরফকল থেকে ডেকে কপালিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনের গলিতে নিয়ে যায়। এরপর দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাঁর মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনার পরপরই কপালিয়া বাজার এবং আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে মনিরামপুর থানা থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
স্থানীয় পুলিশ সূত্র জানায়, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি এবং কেশবপুর থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার বিস্তারিত তাৎক্ষণিক জানা যায়নি। রানা প্রতাপ বৈরাগীর মাথায় তিনটি গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মনিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রজিউল্লাহ খান।
পুলিশের এই কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে (তিনি) বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর হয়েছে। ওসি আরো বলেন, তাঁকে হত্যা কারণ এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।
অপরদিকে চট্টগ্রামের রাউজানে আবারও দুর্বৃত্তের গুলিতে জানে আলম সিকদার (৫০) নামে এক বিএনপি নেতা নিহত হয়েছেন। গেল সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট এলাকার সিকদারপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলটি পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। নিহত জানে আলম স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী নিহতের পরিবারের লোকজন সাংবাদিকদের জানান, মুখোশ পরা তিন যুবক মোটরসাইকেলে করে এসে জানে আলমের বাড়ির সামনে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এরপর তারা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। তার বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় জানে আলমকে উদ্ধার করে প্রথমে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
২০২৪ সাল, গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ১৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৩টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এর আগে যুবদলের কর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারও আগে গত বছর ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর খুন হন বিএনপির কর্মী মুহাম্মদ আবদুল হাকিম (৫২)। রাউজানের খামারবাড়ি থেকে ফেরার পথে হাটহাজারীর মদুনাঘাটে চলন্ত গাড়িতে গুলি করে হত্যা করে অস্ত্রধারীরা। এ ঘটনায়ও অস্ত্রধারীদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম বাবুল স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, নিহত জানে আলম সিকদার বিএনপির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে একই ইউনিয়নের যুবদলের সভাপতি ছিলেন। তিনি আরও বলেন, রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। পুলিশের ভূমিকাও আমরা বুঝতে পারছি না।
অতিসম্প্রতি রাজধানী ঢাকা ও এর বাইরে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গত ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে একটি দোকানের ভেতর গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে, পুরান ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। চট্টগ্রামে বিএনপির এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় ‘সন্ত্রাসী’ সারোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা করা হয় কয়েক দিন আগেই। ১৬ নভেম্বর খুলনার করিমনগরে আলাউদ্দিন মৃধাকে তার বাড়ির ভেতর গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় পুলিশ ঘাতক গৃহকর্মীকে গ্রেফতারও করে। তেজগাঁও কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রদলের মোর্শেদ তরুণ সেলিম গ্রুপ এবং সুইডেন আসলাম গ্রুপের হামলার ঘটনায় ৫ দিন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের আইসিউতে থাকার পর গত বুধবার মারা যান সাকিবুল হাসান রানা। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করেছে।
অপরদিকে গত রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর বনশ্রী ডি ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ির সামনে স্বর্ণ-ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। তাকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার ও এক লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রাজধানীবাসী। বিশেষ করে ঘটনাস্থল বনশ্রীসহ স্থানীয় বেশ কয়েকটি গ্রুপে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। পরে সোমবার রাত থেকেই স্থানীয়রা রাতভর সম্মিলিত পাহারার উদ্যোগ নিয়েছেন। ক্ষুব্ধ এলাকবাসীর বলছেন, সরকার যেহেতু আমাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেদেরই নিতে হবে। তাই সোমবার রাত থেকে সবাই মিলে ব্লকভিত্তিক পাহারার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপির দেওয়া তথ্য মতে, গত ১০ মাসে রাজধানীতে ১৯৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ, মাসে গড়ে প্রায় ২০টি। রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় বসবাসরত বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আরাফাত রহমান বলেন, আমরা এখন তো প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যেই থাকি। প্রতিনিয়ত যে ঘটনাগুলো ঘটছে তাতে করে আমরা বাইরে বের হলে একদিকে যেমন নিজে আতঙ্কের মধ্যে থাকি অন্যদিকে পরিবারও থাকে আতঙ্কের মধ্যে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপরতা বাড়ানো উচিত। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আসছে, এ রকম ঘটনা যেন না বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ালে জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে অথবা আতঙ্কের মধ্যেই আমাদের চলতে হবে। আজ অন্য কেউ কাল আমার ক্ষেত্রেও ঘটনা ঘটতে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত এক বছরে মব ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত, রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন, সীমান্তে অন্তত ৩০ জন নিহত এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার সংখ্যা উদ্বেগ জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যা একটি ভাঙা পরিবার, ভাঙা জীবন ও ভাঙা সামাজিক বন্ধনের সাক্ষ্য। মব সহিংসতা ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, স্থানীয় আধিপত্য ও আইনশৃঙ্খলার শিথিলতা মিলিয়ে প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে; রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা ও মামলায় নামজারি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে; সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ও পুশব্যাক কূটনৈতিক ইস্যু ছাড়িয়ে মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে; সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশে বাধা তথ্যপ্রবাহ ও জবাবদিহিতা দুর্বল করে দিচ্ছে; আর নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম শর্ত হলো স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত-বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু ও সীমান্তের ঘটনার প্রতিটি কেসে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী ইউনিটে মানবাধিকার প্রশিক্ষণ জোরদার করে ত্রুটিপূর্ণ আচরণ রোধ করতে হবে। তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর প্রটোকল ও আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। চতুর্থত, নারী ও শিশুর জন্য দ্রুত বিচার, মানসিক ও চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থা অবিলম্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও ধর্মীয় ও শিক্ষাব্যবস্থা সহ সকল স্তরের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রতিবেদনকে কেবল তথ্যের ভাণ্ডার হিসেবে রেখে দিলে চলবে না; এটিকে পরিবর্তনের কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে-স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে আমরা সমাজকে পুনর্গঠন করতে পারি। এখনই সময় সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়ার; নইলে ক্ষত সারানো কঠিন হয়ে উঠবে। আমরা আশা করি সরকার, বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সরকার যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে অটল এবং যারা এই নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবেন, তারা ব্যর্থ হবেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এবারের জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো বা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সর্তক থাকবে। দেশে এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রচার-প্রচারণাকালে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমি সাধারণ জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি-সবাই যেন নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে সহযোগিতা করেন এবং নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলেন।
এদিকে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠিতব্য আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির পর্যালোচনা সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, গত ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে চালু হওয়া অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ অভিযানে গতকাল ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ১৪,৫৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাছাড়া এ অভিযানে ২০১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৫৪১ রাউন্ড গুলি, ৫৬৬ রাউন্ড কার্তুজ, ১৬৫টি দেশীয় অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি, বোমা তৈরির উপকরণ, ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় মামলা ও ওয়ারেন্টমূলে ১৯,২৩৫ জন সহ সর্বমোট ৩৩,৮০৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ এর অংশ হিসেবে চেকপোস্ট ও টহলের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে যাতে সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীরা পার না পেয়ে যায় এবং অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার আরো বৃদ্ধি পায়।