মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
চরম জনবল সংকটে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কাগজ-কলমে ৫০ শয্যা হলেও এখনো চলছে ৩১ শয্যার আদলে। ৩ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবায় মাত্র দুজন মেডিকেল অফিসার ও ইউনিয়ন ভিত্তিক পাঁচ জন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার। চিকিৎসক সহ নানা সংকটের কারণে রোগীদের অভিযোগের পাহাড় মাথায় নিয়ে চলছে আশাশুনির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
সরেজমিন দেখা গেছে,আশাশুনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০১৫ সালে খাতা কলমে ৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখনো চলছে ৩১ শয্যার আদলে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.নিতীশ কুমার গোলদার,মেডিকেল অফিসার ডা.প্রসুন মণ্ডল,ডা.এস,এম নাঈম হোসেন নয়ন ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ডা.আমিনুল ইসলাম কর্মস্থলে আছেন। ডেন্টাল সার্জন ডা.ইমরান হোসেন গত ৪ ডিসেম্বর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ট্রেনিংয়ে গেছেন। মঞ্জুরিকৃত জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি,মেডিসিন,এনেসথেসিয়া,গাইনি,শিশু,অর্থোপেডিক,চর্ম ও যৌন,চক্ষু,ইএনটি,কার্ডিওলজি,টি.বি বিভাগের চিকিৎসকের পদ প্রায় ২ থেকে ৫ বছর ধরে খালি পড়ে আছে। সিনিয়র স্টাফ নার্স ২৫ জনের স্থলে আছেন ২৩ জন,২ জন প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত। মিডওয়াইফ নার্স ৪ জনের স্থলে ৩ জন কর্মরত আছেন। ২০২২ সাল থেকে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ, ২০২৩ সাল থেকে টেকনেশিয়ানের অভাবে এক্সরে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম বন্ধ।
তৃতীয় শ্রেণির মঞ্জুরিকৃত প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষকের পদটি দীর্ঘ দিন ধরে শূন্য। অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক তিনটি পদের বিপরীতে আছেন দুই জন। এর মধ্যে এক জন প্রেষণে টি.বি ক্লিনিকে। চিকিৎসা সহকারী (উপজেলা) দুটি পদের কেউ নেই। চিকিৎসা সহকারী (ইউনিয়ন) ১১টি পদের বিপরীতে ছয়জন কর্মরত আছেন,পাঁচটি পদ অননুমোদিত শূন্য। ফার্মাসিস্টে মঞ্জুরিকৃত পদ দুটি,আছেন এক জন তিনিও আবার প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত,ফলে কার্যত জনবল শূন্য। মেডিকেল টেকনিশিয়ান (ল্যাব) দুটি পদের বিপরীতে আছেন এক জন,ডেন্টাল বিভাগের টেকনেশিয়ানের পদটি শূন্য। স্যানিটারি ও ইপিআই টেকনিশিয়ান আছেন কিন্তু রেডিও টেকনিশিয়ান নেই। স্বাস্থ্য পরিদর্শক ৪টি পদের বিপরীতে আছেন তিন জন, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ১১টি পদের বিপরীতে আছেন আট জন,তিনটি পদ শূন্য। স্বাস্থ্য সহকারী ৫৪টি পদের বিপরীতে আছেন ৪৯ জন,পাঁচটি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ১০৩টি থাকলেও পূরণ আছে ৬৪টি, ৩৯টি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে মঞ্জুরীকৃত অফিস সহায়ক চারটি পদের বিপরীতে কেউ নেই, ওয়ার্ড বয় তিনটি পদের কেউ নেই, আয়া দুটি পদের কেউ নেই, নিরাপত্তা প্রহরী দুটি পদের কেউ নেই, মালির পদ শূন্য, কুক/মশালচি দুই জনের কেউ নেই। সুইপার পাঁচটি পদের বিপরীতে আছেন দুই জন। প্রয়োজনীয় সুইপার না থাকায় শৌচাগার গুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে চতুর্থ শ্রেণির ১৯ পদে আছেন ১১ জন, বাকি পদ শূন্য। গোটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুধু নেই আর নেই। এ ছাড়া ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা আওতায় যাওয়ায় দায়িত্ব প্রাপ্ত সিএইচসিপি সদস্যরা অনিয়ন্ত্রিত ভাবে চলছে, অনেকেই ইচ্ছে হলে অফিসে আসেন,না হলে বন্ধ থাকে। উপজেলা অফিসে তাদের কোনো জবাব দিহিতা করতে হচ্ছে না। এ জন্য তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সেবা নিতে আসা বলাবাড়িয়া গ্রামের মাধুরী মণ্ডল জানান, ছেলেকে নিয়ে চর্ম রোগের চিকিৎসা নিতে এসেছিলাম,কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই,জরুরি বিভাগে দেখিয়েছি কিন্তু ওষুধ নেই।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.নিতীশ কুমার গোলদার বলেন, জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা দিতে আমরা খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। জনবল না থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ইনডোর রোগীর সংখ্যা একে বারেই কমে গেছে। সে জন্য ওষুধ বরাদ্দ কম আসছে। এখানে আবাসন ব্যবস্থা খুবই খারাপ। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শুকনা মৌসুমে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়,ফলে ব্যবহার্য পানি সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। উপজেলা সদরের আশ পাশে চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করার সুযোগ না থাকায় অনেকেই এসে বদলি হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কমিউনিটি ক্লিনিকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন,সিএইচসিপি সদস্যদের অবকাঠামো গত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বরাদ্দের প্রয়োজন। সব মিলিয়ে উপজেলার ৩ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের প্রয়োজনীয় জনবল সংকট নিরসনে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আশাশুনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবার সবাই আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা পাবেন।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা.আ.সালাম বলেন, আশাশুনি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট আছে। বিষয়টি লিখিত আকারে ওপর মহলকে অবহিত করা আছে। ৪৮ বিসিএসে নতুন করে ৪ হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উনাদের পোস্টিং দিলে আমাদের এখানে সংকট দূর হবে বলে আশা করি।
৫০ শয্যা হাসপাতালে কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি আরও বলেন, ৫০ বিশিষ্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক অনুমতি পেয়েছি কিন্তু এখনো আর্থিক অনুমতি পাইনি। বিষয়টি উদ্বোধন কর্তৃপক্ষকে জানানো আছে। দ্রুতই আর্থিক অনুমোদন পাব বলে আশা করছি এবং এটা পেলে কার্যক্রম শুরু হবে।