মিহিরুজ্জামান সাতক্ষীরাঃ
কাঁকড়া চাষে সাতক্ষীরার সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। চিংড়ির সাদা সোনার রাজত্ব একচেটিয়া ছিল,সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে কালো সোনা খ্যাত সফটশেল কাঁকড়া। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী,২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সাতক্ষীরা থেকে রপ্তানি হয়েছে ৬৪৪ মেট্রিক টন সফটশেল কাঁকড়া,যার বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ৩৬৪ জন চাষি সাতক্ষীরা জেলার ৩২১ স্থানে সফটশেল কাঁকড়া চাষ করছেন। যার বছরে উৎপাদন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন।
৮০ দশকে উপকূল জুড়ে চিংড়ি চাষে ছিল ব্যস্ততা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে সঠিক আবহাওয়া না পাওয়ায় চিংড়ির উৎপাদন কমতে থাকে। ঝুঁকি বাড়তে থাকায় চাষিরা নতুন বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। সেই বিকল্প এখন কাঁকড়া চাষ। উপকূলের ১০ পা বিশিষ্ট কাঁকড়া এখন রপ্তানি হয় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান, ইউকে, ইউএই, সৌদি আরব, তাইওয়ান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র সহ অন্তত ২০-২৫ দেশে। বিশ্ব বাজারে সফটশেল কাঁকড়ার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এই কাঁকড়া চাষকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক নতুন শিল্প। মুন্সিগঞ্জের কলবাড়ি থেকে নীলডুমুর পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে কাঁকড়া ডিপো, খামার ও ব্যবসা কেন্দ্রের সারি। শুধু স্থানীয়রা নয়,বাইরের লোক জনও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবিকা বদলে ফেলছেন।সাতক্ষীরা,শ্যামনগর,আশাশুনি,কালিগঞ্জ,দেবহাটা ও তালা উপজেলায় হাজারো পরিবার কাঁকড়া আহরণ, সংগ্রহ বা বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। অনেক নারী-পুরুষের জন্য এটি এখন প্রধান জীবিকা। বুড়িগোয়ালিনী ও নীলডুমুর সড়কের দু’পাশ জুড়ে সারি সারি খাঁচা। তার ভেতরে কাঁকড়া। নদী পাড় থেকে শুরু করে গ্রাম ঘেঁষা জলাশয় সব জায়গায় ব্যস্ততা কাঁকড়া নিয়ে। কাঁকড়া চাষি মকবুল হোসেন বলেন,আমাবশ্যা-পূর্ণিমার সময় কাঁকড়ার ব্যবসা জমে ওঠে। শীতে মাদি কাঁকড়ার চাহিদাও বেশি থাকে। ২ মাস পর পর বিক্রি করি, ভালোই আয় হয়।
মুন্সিগঞ্জের রঞ্জন মণ্ডল বলেন,১০ কাঠা জমিতে সারা বছর কাঁকড়া চাষ হয়। ৫ সদস্যের সংসার আর ২ ছেলের পড়া লেখার খরচ কাঁকড়া চাষ দিয়েই চলে। এই খাতে ৮-১০ হাজার বেকার যুবক-যুবতীর কাজ হচ্ছে। কাঁকড়া চাষে চ্যালেঞ্জও আছে। কাঁকড়ার রেণু বা ক্রাভলেট সংগ্রহ এখন বাজার নির্ভর। সুন্দরবনে রেণু কমে আসার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। হ্যাচারি না থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভর। চাষির ভাষায়,কাঁকড়ার মজুদ নিরূপণ করা গেলে আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা যেত। হ্যাচারি ছাড়া এই খাত স্থায়ীভাবে বাড়ানো কঠিন।
মৎস্য কর্মকর্তার মতে,হ্যাচারির জন্য মা কাঁকড়া দরকার,যা সুন্দরবনে পাওয়া কঠিন।এ ছাড়া কাঁকড়ার জন্য ৩০-৩৫ পিপিটি লবণাক্ততা দরকার আমাদের বেশির ভাগ এলাকায় তা নেই।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন জনায়,ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত খাঁচা বন্দি কাঁকড়া চাষে খাবার হিসেবে তেলাপিয়া মাছ কেটে দেওয়া হয়। আর চাষিরা নিয়মিত নজর রাখেন কাঁকড়ার খোলস বদলানোর ওপর। ২০-২২ দিনের মধ্যেই ওজন বাড়লে কাঁকড়া রপ্তানির উপযোগী হয়।
স্থানীয় চাষি মতিউর রহমান বলেন,৬ বিঘা জমিতে কাঁকড়া চাষ করে এখন ভালো ভাবেই সংসার চলছে। নারীরাও এই কাজে যুক্ত হয়ে মাছ কাটে,খাঁচা পরিষ্কার ও কাঁকড়া আলাদা করে।
স্থানীয় যুবক জাফর সাদিক সোহাগ বলেন,গ্রামের মানুষের ভালো কর্মসংস্থান হচ্ছে। নারীরাও আয় করছেন। খুব লাভ জনক চাষ।
সাতক্ষীরার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন,কাঁকড়া চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রশিক্ষণ চললেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হ্যাচারি নেই। থাকলে সারা বছর উৎপাদন সম্ভব হতো।
তিনি আরও জানায়,সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ বছরে ৫ মাস বন্ধ থাকে। তাই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সহায়তা দিলে এই শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে।